PACS বনাম Microfinance: সরকারের নীতি, চক্রান্ত ও কৃষকের বাস্তবতা
আজকের গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে যে বড় বিতর্ক চলছে তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে PACS এবং Microfinance প্রতিষ্ঠান। কৃষক আসলেই কাদের ওপর নির্ভর করতে পারবে? সরকার কি সত্যিই কৃষকের পাশে আছে, নাকি কর্পোরেট প্রভাবিত নীতির কাছে গ্রামীণ স্বার্থ হারিয়ে যাচ্ছে? এই লেখায় আমরা শুধু তথ্য নয়, মনের গভীর থেকে উঠে আসা যন্ত্রণার ইতিহাস তুলে ধরব।
১) PACS-এর জন্ম ও উদ্দেশ্য
PACS (Primary Agricultural Credit Society) তৈরি হয়েছিল সাধারণ কৃষককে সহায়তা করার জন্য। এটি ছিল সমবায়ের সবচেয়ে সহজ স্তর – যেখানে গ্রামেই কৃষকরা নিজেরাই সঞ্চয় গড়ে তুলে একে অপরকে স্বল্প সুদে ঋণ দিতেন। স্বাধীনতার পর এই মডেল কোটি কোটি কৃষকের ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সরকারি নীতি তাদের সীমাবদ্ধ করে ফেলে। PACS-কে শুধু কৃষি ঋণের মধ্যে আটকে দেওয়া হয়, অথচ বাণিজ্যিক ব্যাংককে দেওয়া হয় শিল্প, বাণিজ্য ও অবকাঠামোর খাত। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি একধরনের বৈষম্যের শিকার হয়।
২) NBFC-MFI: নতুন শক্তির আবির্ভাব
২০১১ সালে RBI আনুষ্ঠানিকভাবে NBFC-MFI (Non-Banking Financial Company – Microfinance Institution) মডেল চালু করে। এর মাধ্যমে কর্পোরেট ও প্রাইভেট সংস্থাগুলো গ্রামীণ বাজারে প্রবেশ করে। তারা ঋণ দিল দ্রুত, কিন্তু সুদের হার ছিল প্রায় দ্বিগুণ। কৃষকরা দ্রুত ঋণ পেলেও ধীরে ধীরে ফাঁদে পড়তে শুরু করল। Spandana, SKS Microfinance-এর মতো কোম্পানি লাভের দৌড়ে কৃষকের কান্না শুনতেই পেল না।
৩) আন্ধ্রপ্রদেশ ২০১০ সংকট: কৃষকের আত্মহত্যার ইতিহাস
২০১০ সালে আন্ধ্রপ্রদেশে ভয়াবহ এক সংকট তৈরি হয়। মাইক্রোফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো কৃষকদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। ঋণ শোধ করতে না পেরে বহু কৃষক আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনায় রাজ্য সরকার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়, RBI তদন্ত শুরু করে, কিন্তু শিকড়ের সমস্যা থেকে যায় – ঋণের চক্রবদ্ধ ফাঁদ।
“ঋণ যে কৃষকের শক্তি হওয়ার কথা, সেটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল।”
৪) প্রকাশ্য কেলেঙ্কারি ও ষড়যন্ত্র
- PMC Bank – HDIL কেলেঙ্কারি: ওয়াধওয়ান পরিবারের সাথে গোপন লেনদেন ঢাকতে গিয়ে হাজার হাজার সাধারণ আমানতকারীর টাকা ডুবল।
- Spandana Sphoorty: IPO প্রক্রিয়ার সময় বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকের স্বার্থ উপেক্ষা করে মুনাফাকেন্দ্রিক দৌড়।
- SKS Microfinance: কৃষকের ঘরে ঘরে গিয়ে অমানবিক কালেকশন প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল।
এই কেলেঙ্কারিগুলো প্রমাণ করে দিয়েছে যে মুনাফার দৌড়ে গ্রামীণ মানুষের রক্ত-ঘামকেও বিক্রি করে দেওয়া হয়।
৫) PACS-এর দুর্বলতা – কেন পিছিয়ে?
PACS-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা মূলধনের অভাব ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা। সরকারের সমান সহায়তা পেলে PACS আজও গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড হতে পারত। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছ নীতির অভাব, কর্মচারীদের অবহেলা – সব মিলিয়ে আজ তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
৬) সমাধানের পথ
- PACS-কে আধুনিকায়ন করতে হবে – CBS, ডিজিটাল ব্যাংকিং, পর্যাপ্ত মূলধন।
- NBFC-MFI-কে কড়া নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে – সুদ সীমা ও কালেকশন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে।
- কৃষককে আর্থিক সাক্ষরতায় শক্তিশালী করতে হবে।
- অতীতের কেলেঙ্কারি (PMC-HDIL, Spandana, SKS) নিয়ে প্রকাশ্য তদন্ত ও দায় নির্ধারণ করতে হবে।
৭) উপসংহার – কৃষকের সত্যিকারের বন্ধু কে?
Microfinance দ্রুত ঋণ পৌঁছে দেয়, কিন্তু তা কৃষকের জীবনে শান্তি আনে না। PACS এখনও কৃষকের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে, যদি সরকার সমান সুযোগ ও মর্যাদা দেয়। কৃষকের চোখের জল মুছতে হলে দরকার স্বচ্ছ নীতি, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রকৃত সহানুভূতি।
সূত্র
- RBI Annual Report, 2019-20, PACS overview.
- RBI NBFC-MFI Directions, 2011.
- World Bank Research: Andhra Pradesh Microfinance Crisis, 2010.
- Economic Times Investigation: PMC Bank-HDIL case, 2019.
- Spandana Sphoorty MFI Annual Report, 2012-2015.
- SKS Microfinance Operational Review, 2010.
- NABARD: PACS Computerisation Project, 2020.
© ArthaPath | Sudipta Malakar
এই লেখা একটি স্বাধীন গবেষণাভিত্তিক ব্লগ, সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদ (মত প্রকাশের স্বাধীনতা) দ্বারা সুরক্ষিত।
