সমবায়ের শিকড় থেকে সংগ্রাম — নবম অধ্যায় (১৯৬৬–১৯৭০)
© ArthaPath | Sudipta Malakar
প্রাককথন — সময়টা শুধু বছর নয়, এক যুগের মোড়
১৯৬৬–১৯৭০ — এই চার বছর কেবল একটি ক্যালেন্ডার-খাতা নয়; এই সময় যে ঠাঁইটাও বদলে দিয়েছে সমবায় আন্দোলনের ইতিহাস, সেটা বুঝতে চাইলে শুধু দফা-দফার ঘটনা নয়, প্রতিটি মানুষের মুখে লেগে থাকা ক্ষুধা, ভয়, লজ্জা আর প্রশান্তির গল্পগুলো জানতে হবে। এই অধ্যায়ে আমি সেই সব কণ্ঠ একে একে তুলে ধরছি — সরকারি নথি না যে বলেছে, ইউনিয়ন স্মৃতি, গোপন বৈঠক, অনাথ-পত্র, পথের আদুলি—এসব মিলে ইতিহাস গড়া।
নোট: নিচে দেওয়া বড় রাজনৈতিক/ঐতিহাসিক দৃশ্যপট ও স্মৃতি-উৎসগুলোই এই অধ্যায় গঠনে ব্যবহার করা হয়েছে—ইতিহাস ও মানুষের স্মৃতি একসাথে মিলে তা যে ছিল তারই স্বরূপ।
১) দেশের রাজনৈতিক ঝড় এবং তার সরাসরি প্রভাব
১৯৬৬ সালের প্রথম দিকে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বে অজানা অনিশ্চয়তা নেমে আসে — লালবাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যু ১১ জানুয়ারি ১৯৬৬, সবকিছু বদলে দেয়। এই শোকের মুহূর্তে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ইন্দিরা গান্ধীর আগমন ঘটে — নতুন যাত্রা শুরু হলেও তৎক্ষণাৎ আস্থা ছিল না; তাঁর নেতৃত্ব তখন অনিশ্চিত মনে হতো।
এই জাতীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল রাজধানীর সমস্যা নয় — রাজ্যস্তরে, গ্রামে, সমবায় অফিসেও মৃদু কিন্তু স্থায়ী ধাক্কা লাগে। কেন্দ্রের দিকভ্রষ্টকরণ, খাদ্য সংকটের চাপ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা — এই সব মিলেই সমবায় কর্মচারীর অবস্থা আরও শোচনীয় হয়।
২) পশ্চিমবঙ্গ: সংগঠিত বিপ্লব নয়, কিন্তু ঢেউয়ের আগুন
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র ৬০-এর শেষভাগে বদলে যায়। ১৯৬৭-এর নির্বাচন ও পরে গঠিত United Front রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় কংগ্রেসকে বড় ধাক্কা দেয় — একদিকে নতুন রাজনৈতিক আশার আলো, অন্যদিকে খাদ্য-ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা ও আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। United Front–এর উঠা-নামা, তারপর ভাঙন, এবং সরকারের উপর পুলিশের কঠোর প্রতিক্রিয়া — সবই রাজ্যের দরজায় অস্থিরতা এনে দেয়।
একই সময়ে নকশালবাড়ি (Naxalbari)–এর গ্রামীণ বিদ্রোহ (১৯৬৭) উত্তরপশ্চিম বাংলায় সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের বীজ বপন করে—গ্রাম সাধারণ মানুষ, জমিদার বিরোধী সশস্ত্র উত্তেজনা, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন—এসবের প্রভাব সমবায় কর্মচারীদের উপর সরাসরি পড়ে। গ্রামে-গ্রামে যে অসন্তোষ জমে উঠছিল, তার মাঝেই ছিল সমবায়ের অফিসগুলো, যেখানে কর্মচারীরা প্রতিদিন কাজ করছিলেন, ক্ষমতার সিদ্ধান্ত তাদের জীবনকে প্রভাবিত করছিল।
৩) খাদ্যসংকট — সমবায়ে চাপ ও দ্বৈত দায়
খাদ্যসংকট কেবল দারিদ্র্যের সংখ্যা নয়; এটা ছিল নৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ। গ্রাম্য সমবায়ই ধান সংগ্রহ ও বন্টনের কেন্দ্রে থাকার কারণে—কর্মচারীরা সরকার ও গ্রামের দুইপাশের চাপে পড়ে যান।
তারা বাধ্যতামূলকভাবে কখনো সরকারী নির্দেশ মেনে মজুতদারদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে, তো কখনো গ্রামের চাপে পড়ে, প্রাণান্তক রাগ-বিরক্তির শিকার হয়।
অফিসে বসে যিনি কৃষকের নামের পাশে ‘বকেয়া’ লিখতেন, রাতে তাঁর নিজের পরিবারের টিফিনে ভাত জোটাতো না। এই দ্বিবন্ধী দায়িত্বই তাদের কাজকে অসহ্য করে তুলেছিল।
৪) ব্যাংক জাতীয়করণ (১৯৬৯) — মর্যাদার প্রশ্ন ও অস্তিত্ব সংকট
১৯৬৯ সালে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জাতীয়করণ করা হয়। সাধারণ মানুষের জন্য এটি এক বৃহৎ বদল, কিন্তু সমবায় কর্মচারীর জন্য তা ছিল এক ভিন্ন ধরণের আঘাত। বহু উচ্চপদস্থ ও রাজনীতিকদের কথায় সমবায়কে ধীরে ধীরে ‘দ্বিতীয়-শ্রেণীর’ হিসেবে দেখা শুরু হয়।
অনেক কর্মচারী তখন ভেবেছিল—আমাদের কাজের ভবিষ্যৎ কি থাকবে? আমাদের মর্যাদা কোথায়?
৫) ইউনিয়ন-সংগঠনের তীব্রতর ধাপ — দাবি, কৌশল, গোপন বৈঠক
১৯৬৬–১৯৭০–এ কর্মচারীরা বুঝলেন আলাদা আলাদা দাবিতে কিছু হবে না; সমন্বিতভাবে রাজ্য স্তরে কাজ করতে হবে।
- জেলা-স্তরের গোপন বৈঠক (কলকাতা, হাওড়া, নদিয়া, বর্ধমান, উত্তরবঙ্গ)
- কোর-চ্যাপ্টার গঠন: গোপন স্মারকলিপি, জেলা প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ
- দাবির রূপরেখা: কেবল বেতন নয়—স্থায়ী নিয়োগ, প্রভিডেন্ট ফান্ড, চিকিৎসা সুবিধা, সন্তানের শিক্ষার নিশ্চয়তা
এই সময় গ্রামের অফিসগুলোতে কর্মচারীর অস্তিত্ব 'নাম-লিখি' করা শুরু হয়—কাগজেই নয়, জনজীবনে দাবির স্বর তুলতে শোনা গেল।
৬) দমননীতি — গোপন নোটিশ, সার্ভেইল্যান্স, এবং নির্বিচার সাসপেনশন
সরকারি পরিচালনায় অনানুষ্ঠানিক নির্দেশ—“অতিরিক্ত দাবি করলে চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে”—এর বাস্তব রূপ ছিল ভয়ংকর: ব্ল্যাকলিস্ট, নজরদারি, অনাকাঙ্ক্ষিত সাসপেনশন এবং বদলি।
প্রতিবাদ মিটিং ভাঙার জন্য পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়; রাস্তায় মিছিলে লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। সরকারি রিপোর্টে এসব কড়া ভাষায় “আইনশৃঙ্খলা লঙ্ঘন” হিসেবে রেকর্ড করা হলেও, মিছিলকারীরা তাদের বকেয়া বেতন বা স্থায়ী নিয়োগ দাবি করছিলেন।
৭) প্রথম শহীদ — একটি নামহীন শোকাবহ সত্য
ইউনিয়ন-ফাইল ও সহকর্মীদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত একটি বেদনাবহ কাহিনি আছে—১৯৬৮ সালে উত্তরবঙ্গে এক সমবায় কর্মচারী পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মারা যান। সরকারি নথিতে তাঁর নাম নেই; শুধুমাত্র ইউনিয়ন-নথি ও স্থানীয় স্মৃতিপত্রে এই ঘটনা মেলে।
সহকর্মীরা তাঁকে আজও ‘প্রথম শহীদ কর্মচারী’ বলে স্মরণ করে।
৮) কোর্ট-শ্রদ্ধা — আইনের পথে লড়াই
১৯৬৯–১৯৭০ সালে কিছু কর্মচারী স্থায়ী নিয়োগ ও ন্যায্য বেতনের দাবিতে আইনি পথে যান। মামলাগুলো দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর হলেও এটি ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নতুন ধারার সূচনা।
ইউনিয়ন স্লোগান: “কাগজে নয়—আদালতে লড়াই চলবে।”
৯) নারীরা—ভাগ্যহারা কিন্তু অদম্য
নারী কর্মচারীরা বেতন-অসাম্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সাংগঠনিক অবহেলায় ভুগতেন। তাদের কণ্ঠ অল্পেই ওঠত; তবে ৬০-এর শেষভাগ থেকে ৭০-এর শুরুতে মহিলারা ধীরে ধীরে নিজস্ব দাবি তোলেন—বেতন সমতা, কাজের মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তার দাবিতে।
১০) পরিবার, শিশু, মরল্য — সংগ্রামের নরম পৃষ্ঠ
ইউনিয়ন স্মৃতি ও পরিবারের বর্ণনায় যে কাহিনি উঠে আসে তা হৃদয় ভেঙে দেয়:
- ৩৫–৪০% পরিবারের সন্তান স্কুল থেকে নামিয়ে নেওয়া হতো ফি দিতে না পারায়।
- অসুস্থ মা-বাবাকে ওষুধ না দেতেই বহু পরিবারের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হত।
- স্ত্রীরা আয়া, সেলাই অথবা টিউশনি করে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন—তাদের শ্রম চোখে পড়েনি, কিন্তু ছিল সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি।
১১) স্থানীয় তথ্য—সংরক্ষিত স্মৃতি ও নথি
এই অধ্যায়ের অনেক নাজুক বিবরণ সরকারি নথিতে নেই; কিন্তু ইউনিয়ন-ফাইল, স্থানীয় পত্রিকা, গোপন স্মারকলিপি এবং প্রবীণ সহকর্মীদের মুখে-মুখে প্রজন্মান্তরে প্রাপ্ত স্মৃতি এখানে দেয়া হয়েছে—কারণ সেই স্মৃতিগুলোই প্রকৃত ইতিহাস বহন করে।
১২) কবে কি বদলাল — টাইমলাইন (সংক্ষিপ্ত)
- ১৯৬৬: শাস্ত্রীর মৃত্যু; রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু।
- ১৯৬৭: United Front–এর উত্থান; নকশালবাড়ি ও গ্রামীণ অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।
- ১৯৬৭–৬৮: খাদ্যসংকট তীব্র; সমবায় কর্মকর্তা গ্রামীণ চাপের অধীনে।
- ১৯৬৮: উত্তরবঙ্গে সহকর্মীর মৃত্যুর ঘটনাসহ দমন-ঘটনা।
- ১৯৬৯: ১৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক জাতীয়করণ — সমবায় কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা-সংকট বৃদ্ধি।
- ১৯৬৯–১৯৭০: আদালতে মামলা, ইউনিয়ন কৌশল পরিবর্তন, ভবিষ্যৎ আন্দোলনের প্রস্তুতি।
১৩) উপসংহার — মলের তলে লুকানো সত্যকে সামনে আনা
এই চার বছর ছিল গ্লানি, লজ্জা, মৃত্যু, কান্না;
কিন্তু একই সঙ্গে এগুলোই ছিল জাগরণের সময়। সমবায় কর্মচারীরা কেবল বেতন চাইলো না—তারা নিজের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ চাইলো। তাদের লড়াই শুধুই আর্থিক ছিল না; এটি ছিল মানবিক অধিকার ও আত্মসম্মানের লড়াই।১৪) পাঠকের জন্য শেষ বার্তা (সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট)
যে মানুষটি কৃষকের কাগজে তার ভবিষ্যৎ লিখে দেয়, সেই মানুষের পরিবার যদি খেতে না পায়, তাহলে সেটাই হলো জাতির ব্যর্থতা। ১৯৬৬–১৯৭০ আমাদের শিখিয়েছে—সংগঠিতভাবে প্রশ্ন তুললে ইতিহাস বদলায়। তাদের এই ত্যাগ-গল্প ভুলে গেলে চলবে না।

