গ্রামীণ ভারতের অর্থনীতিতে সমবায় ছাড়া কি সত্যিই কোনও বিকল্প আছে
© ArthaPath | Sudipta Malakar
গ্রামীণ ভারত মানেই শুধুমাত্র কৃষি নয়। গ্রামীণ ভারত মানে কোটি কোটি পরিবার, প্রান্তিক কৃষক, ভাগচাষি, দিনমজুর, পশুপালক, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং ছোট ব্যবসায়ী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কোনও কর্পোরেট বোর্ডরুম থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় না। এটি চলে মাটির কাছ থেকে, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। আর এখানেই সমবায় ব্যবস্থার গুরুত্ব।
কৃষকের বাস্তবতা: নীতিপত্রে নয়, মাঠে
একজন প্রান্তিক কৃষকের কাছে ঋণ মানে শুধুই টাকা নয়। ঋণ মানে বীজ, সার, সেচ, শ্রম এবং শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। প্রাইভেট ব্যাংক বা NBFC যেখানে ক্রেডিট স্কোর, গ্যারান্টর এবং নির্দিষ্ট EMI কাঠামো দেখে, সেখানে কৃষকের আয় নির্ভর করে আবহাওয়া ও ফসলের ওপর। এই বাস্তবতা বোঝার মতো প্রতিষ্ঠান কেবল স্থানীয় স্তরে গড়ে ওঠা সমবায়ই পারে।
সমবায় কেন আলাদা এবং কেন অপরিহার্য
সমবায় কোনও বাইরের মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি সদস্যদের দ্বারা গঠিত, সদস্যদের জন্য পরিচালিত। এখানে গ্রাহক নয়, মানুষই মূল। একটি PACS বা সমবায় ব্যাংক জানে কোন কৃষকের জমি কোথায়, তার ফসল চক্র কী, তার আগের ইতিহাস কী। এই মানবিক জ্ঞান কোনও অ্যালগরিদম বা অ্যাপ দিতে পারে না।
© ArthaPath | Sudipta Malakar
বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা
- মাইক্রোফাইন্যান্স: দ্রুত ঋণ দিলেও সুদের হার বেশি, চাপও বেশি।
- ডিজিটাল লোন অ্যাপ: সহজ মনে হলেও পরবর্তীতে হয়রানি ও মানসিক চাপ তৈরি করে।
- প্রাইভেট ব্যাংক: গ্রামে শাখা থাকলেও সিদ্ধান্ত হয় শহরে বসে।
এই ব্যবস্থাগুলোতে গ্রাহক একজন সংখ্যা মাত্র। সমবায়ে তিনি অংশীদার। এই পার্থক্যটাই সমগ্র ব্যবস্থাকে আলাদা করে।
জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা
গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হলে দেশের অর্থনীতি কখনও শক্ত হতে পারে না। ভারতের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ আজও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি ও গ্রামীণ কার্যকলাপের ওপর নির্ভরশীল। সমবায় ব্যবস্থা গ্রামে অর্থের প্রবাহ বজায় রাখে, স্থানীয় বাজার সচল রাখে এবং ঋণের চক্রকে শহরমুখী হওয়া থেকে আটকায়।
যেখানে কর্পোরেট ব্যাঙ্কিং মডেল মূলত বড় আমানত ও বড় ঋণকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে সমবায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে মূলধনে রূপান্তর করে। এই ক্ষুদ্র সঞ্চয়ই গ্রামীণ ভারতের প্রকৃত শক্তি।
সরকারি প্রকল্প ও সমবায়: মাঠের বাস্তবতা
কিষাণ ক্রেডিট কার্ড, ফসল বীমা, সুদ ভর্তুকি বা সরাসরি ভর্তুকি—এই সব প্রকল্প কাগজে যতটা সুন্দর, মাঠে তার বাস্তবায়ন ততটাই নির্ভর করে সমবায়ের ওপর। কারণ গ্রামে শেষ প্রান্তের কৃষকের কাছে পৌঁছনোর মতো অবকাঠামো এখনও সমবায় ছাড়া কারও নেই।
ডিজিটাল ভারত ও সমবায়ের ভূমিকা
ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং গ্রামে ঢুকেছে ঠিকই, কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা এখনও অসম। সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোই আজ মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করছে—আধার, DBT, মোবাইল ব্যাঙ্কিং শেখানো থেকে শুরু করে ডিজিটাল প্রতারণা সম্পর্কে সতর্কতা পর্যন্ত।
যদি সমবায় না থাকে, তাহলে কী হবে
যদি সমবায় ব্যবস্থা দুর্বল হয় বা ভেঙে পড়ে, তাহলে গ্রামীণ ঋণ পুরোপুরি উচ্চ সুদের ফাঁদে পড়বে। কৃষক ঋণ নেবে দ্রুত, কিন্তু শোধ করতে গিয়ে সর্বস্ব হারাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার ওপর।
সমবায় ব্যবস্থার সমস্যা ও তার যুক্তিভিত্তিক সমাধান
স্বীকার করতে হবে, সমবায় ব্যবস্থায় দুর্নীতি হয়েছে, প্রশাসনিক ব্যর্থতাও হয়েছে। কিন্তু যুক্তি বলে, কোনও ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলেই সেটিকে ভেঙে ফেলা সমাধান নয়। সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিই একমাত্র পথ।
যুক্তির শেষ কথা
যদি আজ সমবায় ব্যবস্থাকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে যে বিকল্পগুলোর কথা বলা হয়, সেগুলো গ্রামীণ ভারতের বাস্তব চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কারণ তারা লাভ বোঝে, কিন্তু জীবন বোঝে না।
গ্রামীণ ভারতের অর্থনীতিতে সমবায় কোনও বিকল্প নয়। এটি প্রয়োজন।
© ArthaPath | Sudipta Malakar
This is an independent research-based blog protected under Article 19 of the Indian Constitution – Freedom of Speech.
