সমবায়ের শিকড় থেকে সংগ্রাম | পর্ব – ৭ (১৯৫৬–১৯৬০)
স্বাধীনতার পর এক দশক: আলো আর অন্ধকারের দ্বন্দ্ব। কাগজে উন্নয়ন, বাস্তবে বঞ্চনা—পশ্চিমবঙ্গের সমবায় কর্মচারীদের জীবনকথা, তথ্যসহ।
স্বাধীনতার পর এক দশক: আলো আর অন্ধকারের দ্বন্দ্ব
১৯৫৬–১৯৬০। ভারত তখন দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পথচলায়। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি-কথায় উন্নয়ন, শিল্পায়ন আর কৃষির প্রসার মুখ্য আলোচনায়। রাস্তাঘাট, বাঁধ, কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—চারিদিকে এক নতুন স্বপ্ন আঁকছে দেশ।
কিন্তু সেই উন্নয়নের কোলাহলে এক শ্রেণির মানুষ ছিল বিস্মৃত—সমবায় কর্মচারীরা। তাঁদের জীবনের প্রতিটি দিন ছিল অনিশ্চয়তা, অনাহার, আর অবহেলার চিহ্নে ভরা।
কারা ছিলেন ক্ষমতায়?
মানুষ জানতেই হবে, কার হাতে ছিল দায়িত্ব, অথচ কেন তাঁরা নীরব রইলেন।
রাষ্ট্রপতি: ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ (১৯৫০–১৯৬২)
সংবিধান রক্ষক—সমবায় কর্মচারীদের জন্য কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেননি।
প্রধানমন্ত্রী: পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু
সমবায়কে কৃষি সংস্কারের হাতিয়ার বলেও কর্মচারীদের পৃথক সুরক্ষা পরিকল্পনা আনেননি।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী: ডঃ বিধানচন্দ্র রায়
বিখ্যাত প্রশাসক—তবু রাজ্যের সমবায় কর্মচারীদের দুর্দশায় কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
সমবায় মন্ত্রী (WB): প্রণবেশচন্দ্র লাহিড়ী
সমবায়ের সম্প্রসারণ হলেও ন্যূনতম সুরক্ষা নীতিমালা কার্যকর করতে ব্যর্থ।
কাগজে কলমে উন্নয়ন, বাস্তবে হতাশা
দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৫৬–১৯৬১): সমবায়কে কৃষক উন্নয়নের ভিত্তি বলা হলেও কর্মচারীদের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ হয়নি।
অন্যান্য রাজ্য
- মহারাষ্ট্র: কর্মচারীদের পেনশন কাঠামোর উদ্যোগ।
- কেরালা: কৃষি সমবায়ে ভর্তুকি—বেতন কাঠামোয় প্রভাব।
- মাদ্রাজ: প্রশিক্ষণ ও প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু।
পশ্চিমবঙ্গ: সম্প্রসারণ হয়েছে, কিন্তু কর্মচারীদের জন্য কোনো নিশ্চিত সুরক্ষা তৈরি হয়নি।
কর্মচারীদের হৃদয়বিদারক অবস্থা
- কালীচরণ দত্ত — যক্ষ্মায় মৃত্যুবরণ; চিকিৎসার টাকা জোটেনি।
- হরিদাস মণ্ডল — সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ; মাসের শেষে ভাতই বড় লড়াই।
- অশোককুমার গুহ — বেতন বন্ধ; সহকর্মীদের ধারেই সংসার।
তাঁদের গল্প ব্যক্তিগত বেদনা নয়—পুরো এক প্রজন্মের নীরব আর্তনাদ।
ঐক্যের আগুন
১৯৫৭–৫৮ থেকে কলকাতা ও জেলা শহরে গোপন বৈঠক শুরু। দাবিগুলো ছিল—
- ন্যূনতম বেতন
- চাকরির স্থায়িত্ব
- অবসরকালীন ভাতা
- চিকিৎসা সুবিধা
- শিক্ষাবৃত্তি
“সরকারের বিরুদ্ধে বললে চাকরি যাবে”— ভয় ছিল সবার; তবু নীরব জ্বালা থেকেই আন্দোলনের জন্ম।
দায় কার?
- কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব (নেহরু সরকার): নীতিতে সমবায় থাকলেও কর্মচারীদের জন্য পৃথক বাজেট নেই।
- রাজ্য নেতৃত্ব (ডঃ বিধান রায়, প্রণবেশ লাহিড়ী): সম্প্রসারণ-কেন্দ্রিক দৃষ্টি; কর্মচারী সুরক্ষা উপেক্ষিত।
- আমলাতন্ত্র: কর্মচারীদের “আধা-সরকারি” ধরে দায়িত্ব এড়ানো।
- সমবায় নেতৃবৃন্দ: জীবনমানের প্রশ্নকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দেওয়া।
ষড়যন্ত্র না হোক, অবহেলা অবশ্যই ছিল—এটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।
হৃদয় মর্মের চিত্র
দিনভর খাতায় কোটি টাকার হিসাব, রাতে সন্তানের মুখে ভাত তোলার লড়াই। স্ত্রীর অসুখে ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই—তবু সকালেই হাজিরা, আবার নতুন দিনের খাতা-কলম। এই বৈপরীত্যই তাঁদের বুকের ভেতর ক্ষত তৈরি করেছে, আর সেখান থেকেই উঠেছে নীরব প্রতিরোধ।
উপসংহার
১৯৫৬–১৯৬০ দেখিয়েছে—কাগজে উন্নয়ন দেখানো যায়, কিন্তু বাস্তবে কর্মচারীর জীবন বঞ্চনায় ভরা। এই নীরব যন্ত্রণা-ই পরবর্তী দশকে আন্দোলনের আগুন হয়ে ওঠে। অবহেলা থেকে সংগ্রামের জন্ম—এই অধ্যায়টি ভুলে গেলে চলবে না।
⚠️ ঘোষণা: এই লেখা কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়; এটি সমবায় কর্মচারীদের ইতিহাসের নথি—যাতে আগামী প্রজন্ম বোঝে, কোনো সংগ্রামই ছোট নয়।
