সমবায় কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় সংকট:
আমাদের ভাঙন, আমাদের নীরবতা
“সমবায়ের শক্তি ভবনে নয়, হিসাবখাতায় নয়, মানুষের হাতে হাত রাখার মধ্যে।”
ভারতের সমবায় আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল একটাই— “একসঙ্গে বাঁচব, একসঙ্গে এগোব।”
কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও আজ বাস্তব সত্য হলো, বহু ক্ষেত্রে সমবায় কর্মচারীদের জীবন থেকে সেই “একসঙ্গে” শব্দটি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
আমি কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা করছি না। আমি বলছি একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞ মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতি থেকে। বছরের পর বছর এই ব্যবস্থার ভেতরে থেকে যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি, যা অসংখ্য নীরব চোখের ভাষায় পড়েছি, তাই আজ কলমে তুলে ধরছি।
এ লেখার উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত করা নয়। উদ্দেশ্য হলো একটি নীরব সত্যকে সামনে আনা। সেই সত্য, যা হাজার মানুষের বুকের ভেতর চাপা কান্না হয়ে রয়ে গেছে।
সমবায়ের মূল শক্তি ছিল ঐক্য
বিশ্বের সমবায় আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হলো গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিত শক্তি। বহু দেশে সমবায় প্রতিষ্ঠান টিকে আছে কর্মী, সদস্য এবং পরিচালনার পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয়ের ওপর।
কিন্তু আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একই ব্যবস্থার ভেতরে থেকেও আমরা ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ি।
- কে কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন
- কার বেতন তুলনামূলক বেশি
- কার সুযোগ-সুবিধা বেশি
- কার পদমর্যাদা বড়
- কে “ভালো অবস্থায়” আছেন
এই তুলনা, এই অদৃশ্য দূরত্ব, ধীরে ধীরে আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়।
সবচেয়ে কঠিন সত্য
বাস্তবতা হলো, বহু সমবায় কর্মচারী সারা জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, কিন্তু অবসরের পর আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
কেউ চিকিৎসার খরচ সামলাতে পারেননি।
কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থেকেছেন।
কেউ সম্মান নিয়ে বেঁচে থেকেও নিরাপত্তাহীনতায় জীবন কাটিয়েছেন।
“যাঁরা সারা জীবন অন্যের ঘরে আর্থিক আলো জ্বালিয়েছেন, তাঁদের নিজেদের ঘরে কখনও কখনও অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে এসেছে।”
এই গল্পগুলো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কিন্তু এগুলোই সমবায় ব্যবস্থার অজানা ইতিহাস।
নীরবতার মূল্য
আমাদের মধ্যে অনেকেই সমস্যাগুলো জানি:
- বেতন বৈষম্য
- পরিষেবা শর্তের অসামঞ্জস্য
- অবসরোত্তর সুরক্ষার অভাব
- পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা
- প্রতিষ্ঠানভেদে সুবিধার বিশাল পার্থক্য
তবু আমরা প্রায়ই চুপ থাকি।
কখনও ভয়ে।
কখনও নিরুপায় হয়ে।
কখনও মনে করি, “আমার একার বলায় কী হবে?”
কিন্তু ইতিহাস বলে— নীরবতা কখনও অধিকার এনে দেয় না। অধিকার আসে যখন মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ায়।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট
পশ্চিমবঙ্গের সমবায় ব্যবস্থা কৃষি, গ্রামীণ ঋণ, ক্ষুদ্র সঞ্চয় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে কর্মরত বহু মানুষের অনুভূতি হলো— প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি যতটা দৃশ্যমান, মানবিক সুরক্ষা ততটা সমানভাবে পৌঁছায় না।
এই উপলব্ধি উপেক্ষা করা উচিত নয়।
Divide and Rule: অদৃশ্য বাস্তবতা
যখন কর্মচারীরা একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তখন বৃহত্তর সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়।
“ও বেশি পাচ্ছে”, “আমি কম পাচ্ছি”, “ওর প্রতিষ্ঠান বড়”, “আমার প্রতিষ্ঠান ছোট”— এই মানসিকতা আমাদের প্রকৃত দাবিকে দুর্বল করে।
ফলে কাঠামোগত বৈষম্য দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অন্যান্য রাজ্য ও বিশ্বের শিক্ষা
যেসব অঞ্চলে সমবায় আন্দোলন শক্তিশালী, সেখানে সাধারণত দেখা যায়:
- কর্মীদের সংগঠিত অংশগ্রহণ
- ন্যায্য পরিষেবা শর্ত
- দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা
- স্বচ্ছ প্রশাসন
- পারস্পরিক আস্থা
অর্থাৎ, টেকসই সমবায়ের ভিত্তি কেবল আর্থিক নয়— মানবিকও।
নতুন সরকারের কাছে আবেদন
এটি কোনো অভিযোগ নয়; এটি মাঠপর্যায়ের মানুষের হৃদয়ের কথা।
- সমবায় কর্মচারীদের পরিষেবা শর্তের যৌক্তিক মানদণ্ড নির্ধারণ
- বেতন ও সুবিধার বৈষম্য পর্যালোচনা
- অবসরোত্তর সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করা
- প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি
- কর্মীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ
সমবায় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে তার কর্মীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে।
সহকর্মীদের প্রতি ব্যক্তিগত আহ্বান
আমরা যদি একে অপরকে প্রতিযোগী না ভেবে সহযোদ্ধা হিসেবে দেখি, তাহলে অনেক কিছু বদলাতে পারে।
ঐক্য মানে সবাই একই মত হবে, তা নয়।
ঐক্য মানে—
সবার সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে একসঙ্গে দাঁড়ানো।
আমার দেখা সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য
আমি এমন বহু মানুষকে দেখেছি যারা সারা জীবন সততার সঙ্গে কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজের সময়, শ্রম, স্বাস্থ্য—সব দিয়েছেন।
আজ তাঁদের অনেকের নাম কেউ জানে না।
তাঁদের সংগ্রাম কেউ লেখে না।
তাঁদের চোখের জল কোনো রিপোর্টে ধরা পড়ে না।
কিন্তু সেই মানুষগুলোর ঘাম, পরিশ্রম এবং ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের সমবায় কাঠামো তৈরি হয়েছে।
শেষ কথা
সমবায় কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়। এটি মানুষের উপর মানুষের আস্থার নাম।
যদি সেই আস্থা আমাদের নিজেদের মধ্যেই না থাকে, তাহলে সমবায়ের প্রকৃত আত্মা দুর্বল হয়ে পড়বে।
আজও সময় আছে।
আমরা চাইলে আবার এক হতে পারি।
আমরা চাইলে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।
আমরা চাইলে সমবায়কে তার আসল অর্থ ফিরিয়ে দিতে পারি।
“বিভাজন নয়, ঐক্য চাই।
অধিকার চাই, মর্যাদা চাই।
কারণ ঐক্য থাকলে অসম্ভব কিছুই নয়।”
সমবায়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু নীতির ওপর নয়, আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপরও।
