বাজেট ২০২৬: ভারতের সরকারি ভান্ডার
টাকার উৎস, টাকার গন্তব্য এবং মধ্যবিত্তের সামনে ধরা এক কঠিন আয়না
প্রতি বছর বাজেট এলেই সাধারণ মানুষের প্রথম প্রশ্ন একটাই— কী সস্তা হল, আর কী দাম বাড়ল?
কিন্তু এই প্রশ্নের আড়ালেই থেকে যায় আরও বড় বাস্তবতা। দেশ চালানোর টাকা আসছে কোথা থেকে, আর সেই টাকা শেষ পর্যন্ত যাচ্ছে কোথায়?
বাজেট ২০২৬-এর পরিসংখ্যান দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়—এই সংকট শুধু বর্তমান সরকারের নয়। এটা স্বাধীনতার পর থেকে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ আর্থিক কাঠামোর ফল, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী আজকের মধ্যবিত্ত সমাজ।
সরকার টাকা পায় কোথা থেকে? (₹ Comes From)
ধরে নিই সরকার মোট ১০০ টাকা আয় করছে।
ঋণ ও অন্যান্য দায় – প্রায় ২৪ টাকা
সরকারের মোট আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ধার করা টাকা।
সহজ উদাহরণে বললে, একটি পরিবার মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করে কিন্তু খরচ ৬৫ হাজার। এই ঘাটতি পূরণ হয় ঋণ দিয়ে। ভারত সরকারের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।
ইনকাম ট্যাক্স – প্রায় ২১ টাকা
এই কর মূলত দেয় বেতনভোগী, পেনশনভোগী এবং স্বচ্ছভাবে হিসাব রাখা মধ্যবিত্তরা। এখানে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কম, তাই সরকারের নির্ভরতা এই শ্রেণির ওপর বাড়ছে।
কর্পোরেট ট্যাক্স – প্রায় ১৮ টাকা
বিভিন্ন কর ছাড় ও ইনসেনটিভের কারণে কর্পোরেট আয়ের তুলনায় প্রকৃত কর আদায় সীমিত। এই ছাড়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ করদাতার ওপর।
GST ও অন্যান্য পরোক্ষ কর – প্রায় ১৫ টাকা
GST এমন কর যা সবাই দেয় কিন্তু বুঝতে পারে না। দিনমজুর আর বড় শিল্পপতি—দুজনেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনলে একই হারে GST দেয়।
নন-ট্যাক্স রেভিনিউ – প্রায় ১০ টাকা
সরকারি সংস্থার লাভ, ফি ও লাইসেন্স থেকে পাওয়া আয়। এই অংশ শক্তিশালী হলে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমত।
নন-ডেট ক্যাপিটাল রিসিপ্ট – মাত্র ২ টাকা
অর্থাৎ সরকারি সম্পদ বিক্রি করেও খুব বেশি আয় হচ্ছে না।
© ArthaPath | Sudipta Malakar
সরকার টাকা খরচ করে কোথায়? (₹ Goes To)
রাজ্যগুলোর করের অংশ – প্রায় ২২ টাকা
এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কেন্দ্র এখানে কাটছাঁট করতে পারে না।
সুদ পরিশোধ – প্রায় ২০ টাকা
প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ২০ টাকা শুধু পুরনো ঋণের সুদ দিতে চলে যাচ্ছে।
এই টাকায় না হাসপাতাল তৈরি হয়, না স্কুল, না কর্মসংস্থান।
কেন্দ্রীয় প্রকল্প – প্রায় ১৭ টাকা
উদ্দেশ্য ভালো হলেও বাস্তবায়নে অপচয় ও অদক্ষতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
প্রতিরক্ষা – প্রায় ১১ টাকা
জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এই খরচ অনিবার্য।
ভর্তুকি – প্রায় ৬ টাকা
ভর্তুকি কমার অর্থ সরাসরি চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন কেন সহজে বাড়ানো যায় না?
অনেকে মনে করেন সরকার ইচ্ছা করেই মাইনে বাড়ায় না। বাস্তবে সমস্যা কাঠামোগত।
যখন আয়ের বড় অংশ সুদে চলে যায়, তখন বেতন বাড়ানো মানেই হয় নতুন ঋণ। আর নতুন ঋণ মানেই ভবিষ্যতের আরও চাপ।
সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী: মধ্যবিত্ত সমাজ
- ইনকাম ট্যাক্স দেয়
- GST দেয়
- ভর্তুকি কম পায়
- বেতন বাড়ে ধীরে
- মূল্যবৃদ্ধি হয় দ্রুত
মধ্যবিত্ত এমন এক শ্রেণি, যারা না পুরো সুবিধা পায়, না পুরো ছাড়।
এটা কি শুধু বর্তমান সরকারের দায়?
না। এই আর্থিক বাস্তবতা স্বাধীনতার পর থেকে ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে।
প্রতিটি সরকার এই কাঠামোর মধ্যেই কাজ করেছে। সমস্যাটা ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত।
শেষ কথা
এই লেখা আতঙ্কের জন্য নয়, বোঝার জন্য।
টাকার উৎস ও গন্তব্য বুঝতে পারলেই আমরা রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারব।
© ArthaPath | Sudipta Malakar
This is an independent research-based blog protected under Article 19 of the Indian Constitution – Freedom of Speech.
